বাংলাদেশের অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের তীব্র সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশি স্বার্থে বাংলাদেশের সম্পদ ও এলাকা কার্যত বিনামূল্যে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার পরিকল্পনা রয়েছে’ বলেও অভিযোগ তাঁর। এই পরিস্থিতি তিনি ‘ইউনূস সরকারকে ছুঁড়ে ফেলার’ ডাক দিয়েছেন।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত ‘সেভ ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তায় তিনি এ আহ্বান করনে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে নির্বাসনে যাওয়ার পর এই প্রথম নয়া দিল্লিতে প্রকাশ্য কোনও অনুষ্ঠানে ভাষণ দিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন রয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু, শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী সরকারকে ‘অবৈধ ও সহিংস’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনে’ নিমজ্জিত।

ভাষণে শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বলেন, বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত একটি ‘পুতুল সরকার’ দেশ চালাচ্ছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাবেক একাধিক মন্ত্রী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা নিজে মঞ্চে উপস্থিত না থাকলেও তার অডিও বার্তা সম্প্রচার করা হয় ভরা মিলনায়তনে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ এক গভীর অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে।’ ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার টেনে এনে বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে একটি ‘সুনিপুণ সাজানো ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই দিনের পর থেকেই দেশ ‘সন্ত্রাসের যুগে’ প্রবেশ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার কথায়, ‘গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে। মানবাধিকার মাটিতে মিশে গেছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিভে গেছে, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা লাগামহীন।’

দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দলবদ্ধ সহিংসতা চলছে। ‘জীবন ও সম্পত্তির কোনও নিরাপত্তা নেই,’ বলেন তিনি।

ভাষণের বেশিরভাগ অংশজুড়ে ছিল অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ। একই সঙ্গে ভাষণে ছিল সমর্থকদের উদ্দেশে আহ্বান। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি’র প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, শহীদদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনরুদ্ধার করতে হবে।

আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ দেশের সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।’ তার দাবি, জনগণের সহায়তায় দলটি আবার ‘ছিনিয়ে নেওয়া সমৃদ্ধ স্বদেশ’ ফিরিয়ে আনবে।

ভাষণে শেখ হাসিনা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন, যা তিনি দেশের ‘আরোগ্য’ নিশ্চিত করতে জরুরি বলে উল্লেখ করেন। প্রথম দাবি হিসেবে তিনি ইউনূস নেতৃত্বাধীন ‘অবৈধ প্রশাসন’ অপসারণের কথা বলেন এবং দাবি করেন, এ সরকার বহাল থাকলে দেশে কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় দাবিতে তিনি প্রতিদিনের সহিংসতা ও নৈরাজ্য বন্ধের আহ্বান জানান, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নাগরিক সেবার জন্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন। তৃতীয় দাবিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার ‘অটল নিশ্চয়তা’ চাওয়া হয়।

চতুর্থ দফায় তিনি সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ বন্ধ করার আহ্বান জানান এবং বিচার বিভাগকে ‘নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তোলেন। পঞ্চম ও শেষ দাবিতে তিনি গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘নতুন ও সত্যিকারের নিরপেক্ষ তদন্ত’ পরিচালনার আহ্বান জানান।

“আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাশে আছে” দাবি করে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “অন্তর্র্বতী সরকার জনগণের কণ্ঠ শুনতে ব্যর্থ হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরাও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।”

এনডিটিভি লিখেছে, শেখ হাসিনার এই বক্তৃতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গভীর বিভাজনের’ চিত্রই তুলে ধরেছে। শেখ হাসিনা বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বনাম চরমপন্থা, বিশৃঙ্খলা ও বিদেশি প্রভাবের’ মধ্যে এক লড়াই হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।

‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘দখল’ ও ‘প্রতিরোধের’ মত শব্দচয়ন করে স্পষ্টতই তিনি সমর্থকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। আর আওয়ামী লীগের এখনকার সংগ্রামকে দলীয় নয়, বরং ‘দেশপ্রেমিক দায়িত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।